Home / শিক্ষা / থমকে আছে এমপিও শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম

থমকে আছে এমপিও শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম

বাবা তুমি চলে যাবে? এই কথাটা বলার পর চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। কি বলবো? করোনার বন্ধ শেষে কর্মস্থলে ফিরতে হয়েছে। বাড়িতে ছোট্ট ছেলে-মেয়ে নাজির হোসাইনের। বড় ছেলের বয়স মাত্র ৪ বছর। আর মেয়ের বয়স মাত্র ১ বছর। কিন্তু চাকরির কারণে ছেলে মেয়ের সঙ্গে থাকা হয় না নাজিরের। তিনি বলেন, পরিবার রেখে এতদূরে থাকতে হয়। প্রয়োজন মতো অর্থও দিতে পারি না।

মাঝে মাঝে নিজেকে এতটাই অসহায় লাগে যে নীরবে কান্না চলে আসে। বিএডবিহীন আমাদের বেতনটাই বা কতো?

নাজির হোসাইনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। চাকরি করেন খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলায়। চংড়াছড়ি এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তিনি। এনটিআরসিএ কর্তৃক প্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত তিনি। বলেন, আমরা ঐচ্ছিক বদলি চাই। আগামী এনটিআরসিএ’র গণবিজ্ঞপ্তির আগে ঐচ্ছিক বদলি চালু হলে শিক্ষকরা নিজ নিজ এলাকায় বা কাছাকাছি আসতে পারবে।

নাজিরের মতো দুঃখ দুর্দশা নিয়ে চাকরি করছেন হাজারো শিক্ষক। বেসরকারি এমপিএওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি প্রথা না থাকায় নানা ভোগান্তির মুখে পড়েছেন শিক্ষকরা। একই স্কুলের আরেক সহকারী শিক্ষক ইমাম হোসেন বলেন, প্রতিষ্ঠান থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরে আমার বাড়ি। চাঁপাই নবাবগঞ্জের নাচোল থানায়। ২০১৬ সালে চাকরিতে যোগদান করি। মা আমি অসুস্থ মাকে দেখতে যেতে পারি না। তিনি খুবই অসুস্থ। মায়ের খরচ দিতে হয় তিন থেকে চার হাজার টাকা। আমরা মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকায় জয়েন করেছি। এই অর্থে আসলে এলাকা ছেড়ে থাকাটা খুবই কষ্টকর। বাড়ি যেতে পারি না নিয়মিত। একবার গেলে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। এত টাকা কই পাবো। তিনি আরও বলেন, আমরা আদালতেও গিয়েছি আমাদের পক্ষে রায়ও এসেছে। নীতিমালা আছে কিন্তু কাজ হচ্ছে না। সর্বশেষ রায়েও বলা হয়েছে এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে যারা নিয়োগ পেয়েছেন বিভাগীয় পছন্দে যেন বদলির ব্যবস্থা করা হয়। তারপরও আমাদের অগ্রগতি নেই।

সিরাজগঞ্জে বাড়ি মো. কায়দে আজম জয়ের। তিনি লক্ষ্মীপুরের দল্টা ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তার পরিবারের সকলেই থাকেন সিরাজগঞ্জে। তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন সময় মানববন্ধনে আমাদের দাবি জানিয়ে এসেছি। এখন আমরা আদালতের ওপর নির্ভর করে আছি। এক মামলায় রায় আমাদের পক্ষেই এসেছে। আরেক মামলায় রুল জারি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এমনও হয় যে- আমাদের পরিবারের কেউ মৃত্যুবরণ করলেও আমরা যেতে পারি না। আর অর্থনৈতিক কারণতো আছেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, আমরা ভিন্ন এলাকার হবার কারণে অনেক সময়ই নানা হয়রানির শিকার হই। বিভিন্ন নির্বাচনে তাদের মনোনীত প্রার্থীর হয়ে কাজ করতে হয়। পরিচালনা পর্ষদের ও নেতাদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হতে হয়। আমাদের কাজের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু কিছুই বলার থাকে না।

চলতি বছরের ২রা জুন ১৩০ শিক্ষকের দায়ের করা রিটের বিপরীতে বদলির বিষয়ে পদক্ষেপের জোর দেন আদালত। এতে বলা হয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করতে পারবে।

২৮শে মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ এমপিওভুক্ত শিক্ষক বদলির ব্যবস্থা রেখে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল-কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২১ জারি করে। এতে বলা হয়, এনটিআরসিএ এর সুপারিশে নিয়োগ পাওয়া এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শিক্ষক/প্রদর্শক/প্রভাষকদের কোনো প্রতিষ্ঠান শূন্যপদ থাকা সাপেক্ষে সমপদে ও সম স্কেলে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের জন্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা প্রণয়ন করে জনস্বার্থে আদেশ জারি করতে পারবে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এই কার্যক্রমটি থমকে থাকার পেছনেও বেশকিছু কারণ আছে। যেমন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বতন্ত্র, আলাদা ধরন ও মানের পরিবর্তন থাকায় এটি নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েও সুফল আসেনি। এছাড়াও পরিচালনা কমিটি আলাদা শিক্ষক কর্মচারীর নিয়োগে ভিন্নতা, বেতনভাতা ও পদোন্নতি নিয়েও আলোচনার টেবিলে জটিলতা দেখা দেয়। এরপর করোনার কারণে এতে চলে আসে ধীরগতি। খাতা-কলমে ও টেবিলের দ্বিমতের কারণে শিক্ষকদের দুঃখগাথা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

এ সমস্যা থেকে সমাধানের কথা বলেন রাজধানীর কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ। তিনি বলেন, নতুন শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রতিবার বিজ্ঞপ্তি দেয়ার আগে বিদ্যমান শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের একটা সুযোগ দেয়া উচিত। বিদ্যমান নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত উভয় প্রকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দেয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান শূন্য আসনে নতুন নিয়োগের পূর্বে স্বেচ্ছায় বদলির আবেদন চেয়ে এনটিআরসিএ প্রয়োজনমতো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারে। বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সমজাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমপদে ও একই বিষয়ে কর্মরত সমঅভিজ্ঞ ইন্ডেক্সধারী আগ্রহী শিক্ষকদের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনলাইনে পছন্দক্রম দিয়ে আবেদন করার সুযোগ দেয়া যেতে পারে।

তিনি বলেন, একই প্রতিষ্ঠানের একই বিষয়ে ও পদে একাধিক আবেদনকারীর মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, আইসিটি জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রকাশনা, চারিত্রিক গুণাবলী, সহশিক্ষা ইত্যাদি এরসঙ্গে দূরত্ব বা জেলা ও উপজেলা কোটা বিবেচনা করে অধিক পয়েন্টপ্রাপ্ত শিক্ষককে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বদলির বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। এভাবে বদলি কার্যকর হবার পর যেসকল প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদ সৃষ্টি হবে সেগুলোতে বিধি মোতাবেক নতুন নিয়োগ প্রদান করা হলে হ্রাস পাবে শূন্যপদ নির্ধারণের জটিলতা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফৌজিয়া জাফরীন বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। খুব শিগগিরই শিক্ষকরা সুফল পাবেন। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটাকে কোনভাবেই ধীরগতি বলা যাবে না। আমরা কাজ করছি।

About admin